ভোটের দিন শক্তি প্রদর্শনের পরিকল্পনা ঐক্যফ্রন্টের

ফারুক মজুমদার (ডেস্ক রিপোর্ট): আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন দলীয় ও সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করে ভোটের মাঠে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ওইদিন ভোর থেকেই সাধারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ দেওয়া, ক্ষমতাসীন দলের যেকোনও বাধা মোকাবিলা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাঁচ শরিক দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের বক্তব্যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৃহৎ শরিক বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীলনেতা জানান, ঐক্যফ্রন্টের নেতারা প্রকাশ্যেই এ বার্তা দিচ্ছেন যে, ৩০ ডিসেম্বর ভোটকেন্দ্রেই সব মনোযোগ দিতে। সারাদিন ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করতেও নেতারা ভোটারদের প্রতি আহ্বান রেখেছেন।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একাধিক নেতা জানান, ভোটের আগে কোনও ক্রমেই সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শন করা যাবে না। বিশেষ করে ভোটের দিন যেকোনও ধরনের বাধা, ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যদিও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ১৫ দিনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র পোলিংশূন্য করতে চায় সরকারি দল। রিজভী বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে সারাদেশে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৫০০ জন ধানের শীষ প্রতীকের কর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে।’

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কেউ কেউ একাদশ জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পক্ষে মত দিলেও কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনে থাকার পক্ষেই মত এসেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনে অনুষ্ঠিত ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই আলোচনাতেও দুয়েকজন নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার মত দেন। বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘নির্বাচন করার কোনও পরিবেশই তার এলাকায় নেই। তার এলাকায় পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় শাসক দলের পেটোয়া বাহিনী সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিনেও তিনি প্রচার কাজ করতে পারেননি।’ পরে এ বিষয়ে এ্যানিকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

বিএনপির ঢাকা মহানগরের দুইনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই কেন্দ্রে-কেন্দ্রে নির্ধারিত দায়িত্বশীলরা অবস্থান নেবেন। এমনকি প্রতিটি ভোটকেন্দ্র রাত থেকেই নজরদারিতে রাখা হবে। কোনও কেন্দ্রে সন্দেহজনক কোনও ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্রবাহিনীকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে স্থানীয় এলাকাবাসীকে সংগঠিত করে প্রতিহত করার নির্দেশনাও রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে সকল স্তরেই গ্রেফতার এড়িয়ে চলার নির্দেশনা রয়েছে।’

অসমর্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনা উল্টো ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে বিএনপির। গত কয়েকদিনের প্রচারণায় বাধা এলেও বিএনপির পক্ষ থেকে শারীরিক কোনও প্রতিবাদ করা হয়নি। শুধুমাত্র লিখিত অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন করেই বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। ফলে বিএনপি সহিংসতায় জড়ায়নি এ বিষয়টি ভোটাররা অবগত আছেন।’

বিএনপির ফরেইন উইংয়ের একাধিক দায়িত্বশীল বলছেন, ইতোমধ্যে কূটনীতিকদের কাছে প্রচারণায় বাধা দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবকে কোপানো, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহিমের ওপর হামলার ঘটনাগুলো অভিযোগ আকারে তাদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের ওপর হামলার খবর, দৃশ্য, ছবি সংগ্রহ করে কূটনৈতিকদের অবহিত করা হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সরকারের ইতোমধ্যে নৈতিক পরাজয় হয়েছে। আওয়ামী লীগকে প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে।’ একারণে ৩০ ডিসেম্বর জনগণকে তাদের মুক্তির জন্য, দেশের ওপর নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা জন্য এবং গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

৩০ তারিখ সকাল বেলা ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ভোট দিয়ে আপনাদের দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনেন। ৩০ ডিসেম্বর ভোটের মাধ্যমে আরেকটি বিপ্লব হবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘এখন আমাদের মূল ফোকাসের জায়গা ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এতোদিন যে ভূমিকা রেখেছে তাতে ভোটের ন্যূনতম পরিবেশ ছিল না। আশা করি আগামী ৪৮ ঘণ্টা ইসি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদেরকে আমরা মেনে নেবো।’

এদিকে, ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর ২২ জন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এর বাইরে তিনটি আসনে স্বতন্ত্র। এই ২৫টি এলাকা ছাড়াও জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা এবং সাংগঠনিক শক্তিপ্রবণ এলাকাগুলোয় পৃথকভাবে কমিটি করার কথা জানিয়েছে দলটির কয়েকটি সূত্র।

জামায়াতের ৮ জন প্রার্থী কারাগারে থাকলেও সংশ্লিষ্ট আসনগুলোয় নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে প্রচার কাজ চালিয়েছে। এইসব এলাকার বাইরে যেসব এলাকায় সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী, সেসব এলাকায় বিএনপির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে নেতাকর্মীরা।

ঢাকা জেলা ছাত্র শিবিরের একজন নেতা বলেন, ‘ভোটের দিন সর্বশক্তি নিয়োগ করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভোট হচ্ছে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান। সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছেন, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে। আমরাও চাই মানুষ ভোট দেবেন এবং গণতন্ত্রকে বিজয়ী করবেন।’